• সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার উত্থান ও পতন

অনলাইন প্রতিবেদন / ৬০৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চে ৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে দৃশ্যমান একজন নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার নাম স্বতঃসিদ্ধ। যে ভারতে অবস্থান করছিলেন, সেখান থেকেই জানতে পেরেছিলেন তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার খবর, এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা। দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা এক নারী সরকারপ্রধান হিসেবে তার রাজনৈতিক যাত্রা যেন নাটকীয়তার ছাপ রেখেছে।

 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি, বিরোধী দলীয় নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী সব রূপেই ছিলেন দৃঢ় ও দৃশ্যমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশ রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনি। তার নাম ছাড়া দেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ।”

 

তবে সমালোচকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ৪৪ বছরের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোই দলকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এর মধ্যে কিছু বিরোধী রাজনৈতিক দল দলের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের দাবি তুলেছেন।

 

 

ভারতে নির্বাসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব

১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। দেশের বাইরে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। ১৯৭৬ সালে সামরিক সরকারের অধীনে পুনরায় নিবন্ধন নেওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাজনীতির মঞ্চে ধীরে ধীরে সক্রিয় হতে থাকে।

 

দলের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দলের পর আব্দুর রাজ্জাক, ড. কামাল হোসেন ও বেগম জোহরা তাজউদ্দিন শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দলের হাল ধরানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। দুই মাস পর তিনি দেশে ফিরে দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

 

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “বঙ্গবন্ধুর কন্যা হওয়ার কারণে শেখ হাসিনার প্রতি দলের মধ্যে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সেই আবেগ ও স্বাভাবিক নেতৃত্বের গুণাবলী তাকে সভাপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।” এরশাদ সরকারের সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জনসাধারণের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে দলের বাইরেও গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়।

 

প্রথম বিরোধী দলীয় নারী নেতা ও গ্রেনেড হামলার শিকার

১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৮৪টি আসন নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দলীয় নারী নেতা হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আন্দোলনের মাধ্যমে জয়লাভ করে ১৩৩ আসনে সরকার গঠন এবং প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালে সংঘাতহীনভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

 

২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে শেখ হাসিনা গ্রেনেড হামলার শিকার হন। নিহত হন ২৪ জন, আহত হন আরও অনেকে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পরমাইনাস টুফর্মুলার মামলায় প্রথমবার জেলে যান।

 

ক্ষমতায় টানা সাড়ে ১৬ বছর ও পতন

২০০৮ সালের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন এবং দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। তবে ৫৭ সেনা কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড, বিডিআর বিদ্রোহ ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতের অবস্থান উচ্ছেদের মতো ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায়

 

২০১৮ সালের কোটা সংস্কারের আন্দোলন ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সরকারী দমন ও গুলি চালানোর ঘটনাও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এই সময়ে শেখ হাসিনা দলকে ‘বাঘের মুখে’ রেখে নিজেকে নিরাপদ করেছেন।

 

নির্বাচনী বিতর্ক ও ক্ষমতার স্থায়ী বন্দোবস্ত

শেখ হাসিনার সমালোচকদের মতে, তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ অর্জনের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একতরফা ভোট, ব্যালট পেপারে সিল ও ডামি প্রার্থী নিয়ে অভিযোগ ওঠে। এছাড়া বিচারবহির্ভূত গুম-খুন, বিরোধী মত ও দলীয় ওপর দমনপীড়নের অভিযোগও আছে।

 

শেখ হাসিনার রাজনীতিতে উত্থান ও পতনের এই ধারাবাহিকতা শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, বরং সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd