
কেউ পুরনো বই রেখে দেয় ঘরের এক কোণে। কেউ আবার বই খুঁজে ফেরে, কিন্তু অভাবের কারণে কিনতে পারে না। এই দুই প্রান্তকে এক সুতোয় বাঁধার ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছিল ‘বই দরকার’। এখন সেই ছোট্ট চিন্তাই হয়ে উঠেছে অনেক শিক্ষার্থীর আলোর দিশা।
২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার পর এক তরুণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না এমন কাউকে, যাকে নিজের পুরনো ইন্টারমিডিয়েটের বইগুলো দিতে পারেন। ঠিক তখনই ফেসবুকের এক গ্রুপে দেখলেন, এক ভাই সেই বইগুলো খুঁজছেন। সেখান থেকেই মাথায় আসে এক বাস্তব প্রশ্ন — আমাদের সমাজে এমন কত শিক্ষার্থী আছে, যাদের বইয়ের অভাবে পড়াশোনা থেমে যায়?
অন্যদিকে, অসংখ্য শিক্ষার্থীর ঘরে অব্যবহৃত বইগুলো ধুলো জমে পড়ে থাকে। এই দুটি প্রান্তকে সংযুক্ত করার ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘বই দরকার Bhadeswar’। ২০২৪ সালের শুরুতে কয়েকজন তরুণ মিলে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এই স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের যাত্রা শুরু করে।
‘বই দরকার Bhadeswar’-এর উদ্দেশ্য একটাই — যে শিক্ষার্থী লজ্জায় বা অসহায়তায় বই চেয়ে বলতে পারে না, তার হাতে বিনামূল্যে বই তুলে দেওয়া।
সংগঠনটি একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পুরনো বই ও গাইড সংগ্রহ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করে। আবেদনকারীদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়, যাতে কেউ বিব্রত না হয়। একইসঙ্গে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও প্রয়োজনীয় সহায়ক গাইড সরবরাহ করা হয়।
তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে — বই ও গাইড সংগ্রহ ও বিতরণ, বিনামূল্যে শিক্ষা পরামর্শ (Consultation Service), ‘পাঠক স্টেশন’ — ফ্রি বুক কর্নার, যেখানে যে কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বই নিয়ে পড়তে পারে।
এ পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ‘বই দরকার Bhadeswar’-এর সরাসরি সেবা পেয়েছে বা তাদের উদ্যোগে উপকৃত হয়েছে।
বই বিতরণের বাইরেও সংগঠনটি কাজ করছে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে। এজন্য তারা বিভিন্ন স্থানে ‘পাঠক স্টেশন’ স্থাপন করেছে — ছোট ছোট ফ্রি পাঠাগার, যেখানে যে কেউ বই নিতে পারে এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে তা ফেরত দিতে পারে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের মানসিক, শিক্ষা ও ক্যারিয়ার সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা দিতে ‘বই দরকার Bhadeswar' কনসালটেন্ট টিম’ বিনামূল্যে পরামর্শ দিয়ে আসছে।
সংগঠনটি ইতিমধ্যে কিছু নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘Wish Box Project’, যেখানে শিক্ষার্থীরা চিঠির মাধ্যমে নিজেদের চাহিদা জানাতে পারবে এবং সংগঠন সামর্থ্য অনুযায়ী তা পূরণে কাজ করবে।
এছাড়া ২০২৬ সাল থেকে ‘Skill Development Program’ নামে বিনামূল্যে কম্পিউটার ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পার্ক, শহীদ মিনারসহ জনসমাগম স্থানে ‘উন্মুক্ত পাঠাগার বক্স’ স্থাপন ও ফ্রি কোচিং সেন্টার পরিচালনার উদ্যোগও চলছে।
‘বই দরকার Bhadeswar’-এর অন্যতম পরিচালক আদিব বলেন,
“আমরা বিশ্বাস করি—একটি বই শুধু পৃষ্ঠায় লেখা কিছু শব্দ নয়, এটি কারও ভবিষ্যতের চাবিকাঠি হতে পারে। আমরা সেই দরজাটা খুলে দিতে চাই।”
একটি ছোট স্বপ্ন, কয়েকজন তরুণ, আর এক মুঠো সদিচ্ছা—এই সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে ‘বই দরকার Bhadeswar’। তাদের উদ্যোগ প্রমাণ করছে, পরিবর্তনের শুরু বড় কোনো জায়গা থেকে নয়; শুরু হয় একটি বই, একটি হাতবদল, আর একটিমাত্র সচেতনতার মুহূর্ত থেকেই।